২০২৩ সালে বাংলাদেশে এই প্রথম মেট্রো রেল চালু হলো।

 আমরা আগারগাঁও হতে উত্তরা উত্তর স্টেশনে যাব। একটাই গন্তব্য। টিকিটের মূল্য ৬০ টাকা। আমার দুইটি টিকিট লাগবে। টাচস্ক্রিনে গন্তব্যে আঙুল ছোঁয়ালাম, ওয়ানওয়ে, দুটো টিকিট, ১২০, সঠিক আছে—এই ঘরগুলো টাচ করলে ১২০ টাকা বিল দেখাল। ১০০ টাকা আর ২০ টাকার নোট ডিভাইসে ঢোকালাম। টিকিট একটা একটা করে বেরিয়ে এলো। এক টিকিটের পর অন্যটি টিকিট আসতে একটু সময় নেয়। গুগল বিজনেস প্রোফাইল তৈরি করুন।  

টিকিট হাতে পেয়ে গেটে টিকিট ধরতেই স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলে গেল। ভেতরে গেলাম। আরেক ধাপ ওপরে উঠে ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে পৌঁছালাম। ইলেকট্রনিক পর্দায় দেখানো হলো কোন গন্তব্যের ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্মে আসবে। একটাই গমনীয় আর একটাই আরম্ভস্থল হওয়ায় এখনো দিককানা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

আগারগাঁও থেকে উত্তরা জবাব স্টেশন পর্যন্ত টিকিটের দর ৬০ টাকা 
আগারগাঁও হতে উত্তরা জবাব স্টেশন পর্যন্ত টিকিটের প্রাইস ৬০ টাকাছবি: এস এস আল আরেফিন 
স্কাউটরা সবাইকে অনুরোধ করছেন, যেন রেললাইনের সমান্তরালে অঙ্কন করে হলুদ দাগের বাইরে সকলেই দাঁড়ান। কোথায় কোথায় ট্রেনের দরজা, তা মার্ক করা আছে। আমরা ভিড় কম দেখে একটা দরজার চিহ্ন অঙ্কন করে জায়গায় দাঁড়ালাম। ট্রেন চলে এলো। ফাঁকা ট্রেন। দরজা খুললে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। 

স্টেশন ঝকঝকে। নিউ ট্রেন ঝলমলে। সবুজ আসনগুলো দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছি। বসে পড়ে ট্রেনের এদিক–ওদিক তাকাচ্ছি। চোখ ভিজে আসতে শুরু করেছে। 

আমার আচ্ছাদন শহরে এমন একটা চমৎকার দৃশ্য আমি দেখছি, এমন একটা যাত্রায় আমি ভাগ নিচ্ছি, জানি লন্ডনে টিউব হয়েছে ১৮৬৩ সালে, নিউইয়র্কে সাবওয়ে হয়েছে ১৯০৪ সালে, সে জন্যই বোধহয় বহু করে আজকের দিনটাকে বিশেষ বলা হয়ে থাকে মনে হচ্ছে। ১৬০ বছর পরে যাত্রা শুরু করলাম, তা সত্ত্বেও ধরে ফেলব একদিন, পুষ্ট দেশগুলোকে। 


ট্রেন চলছে। চট্টগ্রাম থেকে আসা ডাক্তার ফিজিসিস্ট দুই বোন, মাদ্রাসার ওয়ানের শিক্ষানবিশ আবু মুসা, ঠাকুরগাঁও হতে আসা যুবক, কুমিল্লা হতে ঢাকায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করার জন্য থাকা তরুণ—আমরা সকলেই এক ট্রেনের যাত্রী। সবার এককথা, ‘ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে।’ 
ট্রেন চলছে। চট্টগ্রাম থেকে আসা চিকিৎসক ফিজিসিস্ট দুই বোন, মাদ্রাসার ওয়ানের শিক্ষানবিশ আবু মুসা, ঠাকুরগাঁও থেকে আসা যুবক, কুমিল্লা থেকে ঢাকায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করার জন্য থাকা তরুণ—আমরা সকলেই এক ট্রেনের যাত্রী। সবার এককথা, ‘ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে।’ বেশির ভাগ যাত্রীই এসেছেন শখে, ১ম মেট্রোতে চড়ার এক্সপেরিয়েন্স নিতে। প্রয়োজনের যাত্রী নেই বললেই চলে। সবাই আগারগাঁও থেকে উত্তরা বা উত্তরা হতে আগারগাঁও আসা-যাওয়া করছেন আনন্দের জন্য। কিন্তু উত্তরা হতে আগারগাঁও দফতর করতে আসছেন, এইরকম মানুষেরা বেজায় খুশি। ওঁদের টাইম বাঁচছে, খরচও বাঁচছে প্রচুর। 


ট্রেন মিরপুর হয়ে ক্যান্টনমেন্ট সাইডে রেখে, নানা স্টেশন দ্রুত পার হয়ে বিরতিহীনভাবে উত্তরা জবাব স্টেশনে এসে পৌঁছাল। আমরা নামলাম। বেরোনোর গেটে টিকেট ঢোকাতে হলো গেটের হাঁ-মুখে। টিকিটটা নিয়ে নিল, আর ফেরত দিল না। বের হয়ে স্টেশন চত্বরে আমরা লক্ষ্য পেলাম ঢাকা মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অতিরিক্ত পরিচালক প্রকৌশলী আবদুল মতিন চৌধুরী আর মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) মোহাম্মদ ইখতিয়ার হোসেনের। 

মতিন চৌধুরী এবং ইখতিয়ার হোসেনের কাছ হতে জানলাম, মেট্রো এই বর্ষের সম্পন্ন নাগাদ চলা চালু করবে মতিঝিল পর্যন্ত। তখন প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী চলাচল করবেন। দিনে ১৬ ঘণ্টা ট্রেন চললে প্রায় ১০ লাখ মানব এই ট্রেনে আসা-যাওয়া করবেন। ঢাকার রাজপথের ওপরে চাপ কমবে। বায়ুদূষণ যাবে। লাখ লাখ শ্রমঘণ্টা বেঁচে যাবে। 

টিকিট কেনার জন্য ১০০ টাকা বা এর চেয়ে ছোট নোট নেওয়া ভালো। ২০০ বা ৫০০ টাকা মেশিন চেনে না। কিন্তু মেশিনে না ক্রয় করে বিক্রেতার কাউন্টার থেকেও টিকিট ক্রয় যায়। 
মহাব্যবস্থাপক ইন ডিটেইলস জানালেন, ১ জানুয়ারির ফানুসবিভ্রাটের ঘটনা। যে পরিষ্কারকারী ট্রেন রোজ সকালে মহড়া দিতে বের হয়, ১ জানুয়ারি তা বেরিয়ে থেমে যেতে বশীভূত হয়। অগণিত ফানুস পড়ে বিদ্যমান ইলেকট্রিক লাইনে, ট্রেনের লাইনে। সেসব পরিষ্কার করার জন্য দুই ঘণ্টা লেগে যায়। উনি অনুরোধ করলেন, আচ্ছাদন ও আশপাশে কেউ যেন ফানুস না ওড়ান। 

এবার আমাদের ফেরার পালা। উত্তরা স্টেশনের টিকেট কাউন্টারে দাঁড়ালাম। এই সময়ে যন্ত্রে নয়, মানুষের হাত হতে টিকিট নিলাম। গতিশীল সিঁড়িতে আরেক স্তর উঠলে প্ল্যাটফর্ম। বিপরীত প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এলো আগারগাঁও থেকে। দুই মিনিট পরে আমাদের প্ল্যাটফর্মে এলো আগারগাঁওগামী ট্রেন। উঠে পড়লাম। প্রকৃতপক্ষে আসলেই ১০ মিনিটে এসে গেলাম আগারগাঁও। স্টেশন থেকে বেরোনোর পথটা আইডিবি বিল্ডিংয়ের জবাব পাশে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি, ঘড়িতে ব্যর্থ ১১টা ৫০। 


মেট্রোরেলে ওঠার আগে ১০টি ইনফরমেশন জেনে নিন

১. মেট্রোরেলের ট্রেন সকাল বেলা ৮টা হতে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলাচল করে। মঙ্গলবার বন্ধ। 
২. আগারগাঁও আইডিবি স্টেশন বা উত্তরা দিয়াবাড়ি স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়তে পারেন। 
৩. টিকিট একদিকে জনপ্রতি ৬০ টাকা। 
৪. টিকিট কেনার জন্য ১০০ টাকা বা এর চেয়ে ছোট নোট নেওয়া ভালো। ২০০ বা ৫০০ টাকা মেশিন চেনে না। কিন্তু মেশিনে না কিনে বিক্রেতার কাউন্টার থেকেও টিকেট কেনাকাটা যায়। 
৫. উত্তরা থেকে আগারগাঁও যেতে বা ফিরতে লাগবে ১০ মিনিট ১০ সেকেন্ডের মতো। তবে লাইনে দাঁড়ানো, টিকিট কেনা, ট্রেনে চড়া মিলে আরও কুড়ি মিনিট লাগতে পারে। কাজেই যাওয়া-আসা মিলে আপনার এক ঘণ্টা লেগে যাবে। 

৬. সিজন টিকেট যাবে। সে জন্য ফরম পূর্ণ করে নিয়ে যেতে হবে। ফরম পাওয়া যাবে এই সাইটে। সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিতে হবে। আর লাগবে ৫০০ টাকা। রোজ বেলা তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত আগারগাঁও বা উত্তরা স্টেশন থেকে সিজন টিকেট কেনাকাটা যাবে। 
৭. স্টেশনগুলোতে স্কাউটরা রয়েছেন পরামর্শ দিতে। রাস্তা দেখাতে। যন্ত্র হতে টিকেট কাটার জায়গাতেও সহযোগিতা করার জন্য লোক নিয়োজিত আছেন। গেটে কার্ড দেখানো বা বেরোনোর টাইম কার্ড ঢোকানোর জন্য আপনাকে হেল্প করতে সহযোগীরা প্রস্তুত আছেন। 


৮. প্ল্যাটফর্ম দেখিয়ে দেওয়ার জন্য স্কাউট আছেন। মনিটরেও প্ল্যাটফর্ম নম্বর ওঠে। লাইনের পাশের হলুদ আঁচড় পার না হওয়ার কথা সহযোগীরা সারাক্ষণ মনে করিয়ে দিচ্ছেন। 
৯. একবার স্টেশনের ভেতরে ঢুকে গেলে দুপুর ১২টার পরেও আপনাকে নিয়ে ট্রেন চলবে। কিন্তু টিকিটের সময়সীমা ১১টা ৫০ পর্যন্ত। 
১০. ট্রেনে, প্ল্যাটফর্ম, আশপাশে কোনো ধরনের নোংরা ফেলবেন না। আমাদের প্লাস্টিক ও পলিথিনের ইউজ কমাতে হবে। ফানুস ঢাকা ও আশপাশে নিষিদ্ধ করার জন্য হবে। ট্রেনের দরজা অফ হওয়ার সময় ঢোকা বা বেরোনোর ট্রাই করা সমীচীন হবে না। কিছু দিন আগে ভারতে এক স্টেশনে এক মানবীর পোশাক ট্রেনের দরজায় আটকে যাওয়ার পর ট্রেন ওনাকে প্ল্যাটফর্মে অনেকটা উপায় টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছে। আমাদের মেট্রোতে এরূপ কতিপয় ঘটুক, আমরা দরকার না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ