আলজেরিয়ান স্বাধীনতাকামীদের আন্দোলনও চলছে পুরোদমে। সেই পটভূমিতে প্যারিসে কেবল আলজেরিয় মুসলিমদের টার্গেট করে প্রশাসন রাত্রিকালীন কারফিউ জারির ডিসিশন নেয়।
এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাতে ১৭ই অক্টোবর ৩০ হাজার ফরাসি আলজেরিয় জড়ো হন প্যারিসের কেন্দ্রে।
এদের মধ্যে ছিলেন ১৫ বর্ষের কিশোরী ফাতেমা বেডার। বাবা-মার নিষেধ অমান্য করে তিনি লুকিয়ে যোগ দিয়েছিলেন ওই প্রতিবাদে।
তার ছোট ভাই জোডির বয়স তখন পাঁচ। সেই ভয়ঙ্কর দিনের ঘটনা নিয়ে এবির জান্নাত জলিলের সঙ্গে কথা বলেন জোডি।
আমার বড় বোন ছিল আমার দ্বিতীয় মা। সে সবসময় আমার সঙ্গে থাকত,বলছিলেন জোডি। আমি ছোট ছিলাম বলা হয়ে থাকে বোন আমার দেখাশোনা করত। আমার বাবামাকে সবসময় সহযোগিতা করত। ডেইলি সকালে আমাকে স্কুলে নিয়ে যেত। তার গায়ের রং ছিল কালো - মাথার চুল ছিল লম্বা।
প্রতিবাদ সমাবেশে যোগদানকারীরা ছিলেন ফ্রান্সের উপনিবেশ স্থাপনকারী শাসন হতে আলজেরিয়ার মুক্তির আদর্শে অনুপ্রাণিত। কিশোরী ফাতেমাও স্বাধীন আলজেরিয়ার কল্পনা দেখতেন।
আলজেরিয়দের উপর জারি করা কারফিউকে বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানাতে ১৭ই অক্টোবর ২৯৬১ প্যারিসে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ৩০ হাজার আলজেরিয়
ওই সমাবেশের দিনকয়েক পূর্বেই আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামী টিম এফএলএন-এর সদস্যদের হাতে নিহত হয় ১১জন ফরাসি পুলিশ। এর উত্তরে প্যারিসে শুধুমাত্র আলজেরিয়ান মুসলিমদের ওপরই রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়।
আলজেরিয়ায় ১৩০ বর্ষের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের দাবিতে এফএলএন গোষ্ঠীর লড়াই সেই সময় সাত সালের পড়েছে। ফ্রন্ট দ্য লিবারেশিওঁ ন্যাশিওনাল বা এফএলএন স্বাধীনতার দাবিতে আলজেরিয়ায় যে আন্দোলন চালাচ্ছিল তার তরঙ্গ তখন ফ্রান্সের আসল ভূখণ্ডেও পৌঁছে গেছে এবং ফ্রান্সে তাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে বেশ কয়েকটি পুলিশ।
কিন্তু প্যারিসে কেবল আলজেরিয়দের টার্গেট করে কারফিউ জারির পর এফএলএন প্যারিসে তাদের আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করে। ফ্রান্সের আলজেরিয় পরিবারগুলোকে তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেবার অভ্যর্থনা জানায়। তাদের আন্দাজ ছিল প্রতিবাদে মেয়ে এবং শিশুরা ভাগ নিলে পুলিশ সহিংসতা বর্জন করবে।
ঐতিহাসিক জঁ লুক ইনওডি বলছেন, ওই প্রতিবাদ বিক্ষোভের আগে থেকেই ফরাসি পুলিশ নিয়মিতভাবে আলজেরিয়দের খুন করছিল।
সেপ্টেম্বরের আরম্ভ থেকে প্রায়ই জঙ্গলে, নদীতে, খালবিলে আলজেরিয়দের মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছিল।
এরপর সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে আর অক্টোবরেও পুলিশ প্যারিসে আলজেরিয়দের ধরপাকড় করতে থাকে। তাদের নিয়ে যাওয়া হতো স্যেন নদীর পাড়ে। সেখানে তাদের অসাড় করে, হাত বেঁধে রাতের বেলা নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হতো আর সবসময় সেটা করা হতো রাতের অন্ধকারে।
আলজিরিয়ায় নিপীড়নের কথা স্বীকার করলো ফ্রান্স
ফ্রান্সে মুসলিমদের 'প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধ' মানতে ম্যাক্রঁ'র আলটিমেটাম
আফ্রিকায় গণহত্যার দায় কবুল ও ক্ষমা প্রার্থনা জার্মানি এবং ফ্রান্সের
প্যারিসের উপকণ্ঠে নানতেরের কাছে আলজেরিয়দের ১টি বস্তি এলাকা। ১৯৬১ সালে এ বস্তি এলাকায় মানবেতর জীবন কাটাতেন ৬০০০ আলজেরিয় মুসলিম বাসিন্দা। সেসময় প্যারিসের নানারকম জায়গায় দেড় লাখের উপর আলজেরিয় দৃঢ় জীবন কাটাতেন
জঁ লুক ইনওডি অনেক বছর ধরে কী ঘটেছে সেই যথার্থ উদঘাটনের ট্রাই করছিলেন। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সংগ্রহশালা হতে তাকে ইনফরমেশন কালেক্ট করতে দেয়া হয়নি। তারপরেও তিনি ১৯৯১ সালে ওই গণহত্যার ওপর তার ১টি বই পাবলিশ করেন।
তার বইতে তিনি সেই সময়ের কর্মকর্তা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ডিটেইলস সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরেন।
প্রতিবাদ সমাবেশের পরদিন ফরাসি শাসকবর্গ জানায়, সেদিনের ঘটনায় মারা গেছে দুজন আলজেরিয়। অথচ জঁ লুকেই নওডির গবেষণায় বেরিয়ে আসে যে শুধু প্রতিবাদের রাতেই মারা গেছে দুশ' মানুষ। এছাড়াও সমাবেশের আগে ও পরে পুলিশের হাতে প্রাণ হারায় আরও অধিক মানুষ।
ঐতিহাসিক মি. ইনওডি এবি কে জানান, ঘটনার দিন প্রতিবাদকারীরা প্যারিসের কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছিল সন্ধ্যেবেলা।
শান্তিপূর্ণ আর ভাবগম্ভীর একটা সমিতিতে যোগ দেবার জন্য তারা বেড়াতে যাবার বেশ ভালো বস্ত্রে সেজে এসেছিল। তারপরও পুলিশ তাদের অনেককে আটক করে এবং তাদের সাথে খুবই সহিংস চালচলন করে। কয়েক হাজার মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয় আটক কেন্দ্রে,বলেন মি. ইনওডি।
এরপরেও বেশি পুরুষ, মেয়ে ও ছোট বাচ্চা মূল সড়কের উপর কোনরকম ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল।
পুলিশ আচমকাই বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তাদের হত্যা করে। কাছেই অন্য কোনো সেতুর ওপরেও বিক্ষোভ সমাবেশ করছিল কয়েক হাজার মানুষ। তাদের ওপরেও চলে গুলিবর্ষণ। সেখানে শুরু হয় নদীতে লাশ ফেলার ঘটনা। পুলিশ অনেকগুলো ব্রিজ হতে বিক্ষোভকারীদের লাশ স্যেন নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
একটা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ রূপ নেয় গণহত্যায়। আন্দাজ করা হয় পুলিশ কমপক্ষে একশ' প্রতিবাদকারীকে খুন করে।
ফাতেমার বাবা-মা এধরনের সহিংসতার আশঙ্কায় মেয়েকে সেদিন প্রতিবাদ সমাবেশে যেতে দেওয়ার জন্য চাননি। তা সত্ত্বেও বাবা-মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করে ফাতেমা লুকিয়ে প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার জন্য গিয়েছিল। সে আর ফেরেনি।
১৭ই অক্টোবর শান্তিপূর্ণ সভায় পুলিশের হাতে নিষ্ঠুর গণহত্যায় নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্যারিসে প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংঘটিত হয় গণহত্যার বার্ষিকীতে
দু সপ্তাহ ধরে মেয়েকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন তার পিতা মা, তাদের সঙ্গে ছিলেন পাঁচ সালের জোডি।
আমার মনে রয়েছে ১৫ দিন আমার প্রসূতি ডেইলি আমার হাত ধরে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন আমার বোনের খোঁজে। জন্মদাত্রী আমাকে কিসের জন্য নিয়ে যেতেন জানি না। তা সত্ত্বেও দেখতাম মা সবসময় দোয়া করছেন আর কাঁদছেন," বলছিলেন জোডি।
অবশেষে পুলিশ ফাতেমার ফেমেলির সাথে যোগাযোগ করে জানায় স্যেন নদীর পাশে নদীটিরই এক ভাগ সেন্ত দেনি খালে তারা ৩১শে অক্টোবর এক কিশোরীর মৃতদেহ পেয়েছে। পুলিশ বলা হয় তাদের সন্দেহ কিশোরীটি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
কিন্তু ওই খালের একই অংশ থেকে পুলিশ আরও ১৪জন আলজেরিয়র মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল।
জোডি বলেন তার বাপ যখন ফাতেমার লাশ শনাক্ত করতে যান, তখন পুলিশ তার বাবার সাথে অন্যায় ব্যবহার করে।
"আমার জন্মদাতা সেখানে পৌঁছলে পুলিশ তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়, তাকে অপমান করে। বর্ণবাদী ওয়ার্ড ব্যবহার করে বাবাকে গালাগালি করে। আব্বা জ্যেষ্ঠ একটা কামরায় ঢুকে দেখেন সেখানে মেঝেতে ১৫টি লাশ রাখা আছে। এর ভিতরে আমার বোনের লাশ পিতা চিনতে পারেন, তার দীর্ঘ কালো চুল দেখে। পনের দিন পানিতে ডুবে থাকায় তার মুখ আর চেনা যাচ্ছিল না," বলছিলেন জোডি।
পড়তে পারেন ইতিাহসের সাক্ষীর পুরনো কিছু পর্ব:
ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় হতে ধর্মনিরপেক্ষদের উচ্ছেদ করা হয় যেভাবে
যেভাবে গড়ে ওঠে কাজাখস্তানের নিউ রাজধানী নূরসুলতান
মুসলিম পৃথিবীর প্রথম দেশ তিউনিসিয়ায় যেরকম ভাবে গর্ভপাত বৈধ হয়।
হাজার হাজার আলজেরিয়দের ধরপাকড় করে বে-আইনিভাবে তাদের জোর করে আলজেরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়
অনেকেই জানত কী ঘটছে, তা সত্ত্বেও কেউ মুখ খুলত না। ব্যাপক সংখ্যায় আলজেরিয়দের জোর করে তখন তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছিল।
বেশ কয়েকটি পুলিশ কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক এ অন্যায় অফ করতে চাইতেন, কথা বলতে চাইতেন। অথচ একটা নিরবতার দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছিল বলা হয়ে থাকে জানিয়ে দেন জঁ লুক ইনওডি।
মি. ইনওডি বলেন অধিক বছর এই বিপুল হত্যাযজ্ঞের খোজ-খবর প্রায় ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়, এর রিজন ছিল সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট দি গ্যল সরকারের বিপুল চাপ।
প্রথমত যেসব সাংবাদিক ঠিকমত রিপোর্ট করতে চেয়েছিল তাদের বাধা দেয়া হয়। ছবি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়। যেসব সাংবাদিক খোঁজখবর নিতে চালু করেন, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। যাতে তারা রিপোর্ট করতে না পারে তার জন্য সবরকম স্টেপ নেয়া হয়। কিছু সাংবাদিক শুধুই সরকারি ভাষ্য প্রকাশ করে।
ঘটনাচক্রে এ গণহত্যার হোতা ছিলেন সেসময় প্যারিসের পুলিশ শ্রেষ্ঠ মরিস প্যাপঁ। কয়েক দশক পর এই ঘটনার কথা ফ্রান্সের বিবেচনা বিভাগের সামনে তাকেই তুলে ধরতে হয়।
0 মন্তব্যসমূহ